নিউজ

হাঁসের মাংস ফরাসিরা যেভাবে খায়


এসেছে শীত। নতুন ধান খেয়ে হাঁসগুলো এখন নাদুসনুদুস হয়ে উঠেছে। নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো ছিট রুটি বা পিঠার সঙ্গে নতুন ধান খেয়ে চর্বি বানিয়ে ফেলা হাঁসের মাংস যে না খেয়েছে, তার জীবনের অনেক আনাই মিছে। অথবা রাজশাহীতে বসে মাষকলাইয়ের রুটির সঙ্গে হাঁসের কষা মাংস—আহা!


হাঁসের মাংসের এমন স্বাদ শুধু বাঙালিদেরই একচেটিয়া নয়; ফরাসিরাও মজা করে হাঁসের মাংস খেয়ে থাকে। তবে সে মাংস বাঙালিদের মতো রসিয়ে কষিয়ে মসলায় জারিত করে রান্না করা নয়। একটু অন্য রকম। আজ সে অন্য রকম হাঁসের মাংসের গল্প বলা যাক।

রন্ধনশিল্প বা খাদ্যসংস্কৃতিতে ফরাসিরা বেশ সমৃদ্ধ। নান্দনিকতা আর বিজ্ঞানের সমন্বয়ে তারা রন্ধনশিল্পকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এ দেশে যারা রন্ধনশিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাদের শিল্পবোধ, বিচক্ষণতা, অধ্যবসায় সত্যিই বিস্ময়কর। তাদের খাদ্যতালিকায় আছে বহু বিচিত্র মুখরোচক খাবার। বাঙালিদের মতো ফরাসিরাও হাঁসের মাংস খুব মজা করে খায়। তবে একটু অন্য রকমভাবে। তারা বড় জাতের বা রাজহাঁসের বুকের তাজা মাংস যেমন খেয়ে থাকে, তেমনি ভীষণ মজা করে খেয়ে থাকে হাঁসের শুকনো মাংস।

হাঁসের বুকের তাজা মাংস বারবিকিউ বা কড়াইতে ভেজে খেতেই সবার বেশি পছন্দ। এতে যেমন সময় বাঁচে, তেমনি প্রস্তুতির তেমন ঝামেলা নেই। পছন্দমতো কম, মোটামুটি বা বেশি ভাজি করে নিলেই হলো। শুধু মনে রাখতে হবে, চামড়া আগে থেকে তুলে ফেলা যাবে না। তাতে মাংসের স্বাদ ও ঘ্রাণ অনেকটাই কমে যায়। আর এতে মাংসের নরম ভাবটাও থাকে না।


তবে সেই সময়, যখন মানুষের ঘরে ঘরে ফ্রিজ আসেনি, তখন খাদ্য, বিশেষ করে মাংস সংরক্ষণ করতে গিয়ে ফরাসিরা হাঁসের বুকের মাংস শুকিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপায় বের করেছিল। তখন থেকে এমন খাবার তাদের খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। এর স্বাদ ও পরিবেশনা সম্পূর্ণ আলাদা।


কীভাবে তৈরি করা হয়

শুরু করার আগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হয়।


উপকরণ

রাজহাঁসের বুকের মাংস এক টুকরো (৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের), বড় দানার লবণ এক কেজি ও গোলমরিচ পরিমাণমতো।


১. পালক ছাড়ানো মাঝারি বয়সের বড় জাতের হাঁস বা রাজহাঁসের বুকের দুপাশের মাংসের দুটি টুকরা পুরো চামড়াসহ খুব সতর্কতার সঙ্গে কেটে নিতে হবে। এ জন্য ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে যেন কাটার সময় এবড়োখেবড়ো না হয়ে যায়। মাংসের টুকরোর সঙ্গে চর্বিযুক্ত চামড়া তুলে ফেলা ঠিক হবে না। চামড়ার নিচে থাকে বেশ পুরো চর্বির স্তর এবং এর পরে চমৎকার এক টুকরো মাংস। চামড়াসহ এমন এক টুকরো মাংস ওজনে ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। মাংসের গায়ে লেগে থাকা বাড়তি চর্বি, শিরা-উপশিরা ইত্যাদি পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।


২. এরপর একটি বড় পাত্রে একটি টুকরার জন্য এক কেজি বড় বড় দানার লবণের অর্ধেকটা ঢেলে দিয়ে মাংসের টুকরোটি তাতে রেখে বাকি অর্ধেক লবণ দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিতে হবে। এরপর একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মাংসের টুকরোসহ পাত্রটি ঢেকে ২৪ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। ২৪ ঘণ্টা পর মাংসের টুকরো লবণ থেকে তুলে পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। ধোয়ার পরে পরিষ্কার কাপড় বা পানি চুষে নেয়—এমন কাগজ দিয়ে বাড়তি পানি শুকিয়ে নিতে হবে। লবণে ঢেকে রাখার কারণে মাংস থেকে অনেক পানি ইতিমধ্যে লবণ চুষে নিয়েছে।


৩. পরে ভালোভাবে গোলমরিচ গুঁড়োর প্রলেপ দিয়ে মাংসের টুকরোটি একটি শুকনো পরিষ্কার কাপড়ে জড়িয়ে তিন সপ্তাহ রেখে দিতে হবে। এই তিন সপ্তাহে শুকিয়ে যাওয়ার ফলে তিন ভাগের এক ভাগ ওজন কম হয়, অর্থাৎ ৩০০ গ্রাম মাংস প্রায় ২০০ গ্রাম হয়ে যায়।

যাঁরা হাঁসের বুকের শুকনো মাংস তৈরি করতে দক্ষ এবং যাঁদের এ ব্যাপারে সুনাম আছে, তাঁরা মাংসের রং, পানির পরিমাণ, স্বাদ ও ঘ্রাণের দিকটা বিশেষভাবে লক্ষ রাখেন। আর তাই গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করেই বাজারে এর মূল্যের হেরফের ঘটে। তা ছাড়া মূল্য নির্ভর করে হাঁসের জাত এবং কোন পরিবেশে লালন পালন করা হয়েছে, সে বিবেচনাতেও। তাই ফ্রান্সের বাজারে এক কেজি হাঁসের শুকনো মাংসের দাম পড়বে ৩৫ থেকে ৫০ ইউরো।


যেভাবে পরিবেশন করা হয়

এই মাংস রান্না করতে হয় না। অনেকেই এতে সুগন্ধি গুল্ম বা মসলা মেশাতে পছন্দ করেন না। তাঁদের মতে, তাতে মাংসের আসল ফ্লেভার বা ঘ্রাণ থাকে না। তবে যাঁরা মাংসের গন্ধ পছন্দ করেন না, তাঁরা চাইলে তাঁদের পছন্দমতো সুগন্ধি গুল্ম বা মসলা মিশিয়ে নিতে পারেন।


মাংসের টুকরো থেকে চামড়া আলাদা করে অথবা ছোট ছোট টুকরা করে চামড়া ছাড়িয়ে তা ফেলে দেওয়া ভালো। তারপর বেশ পাতলা এবং ছোট ছোট টুকরো করে কেটে পরিবেশন করা হয়। আর পরিবেশন করতে অনেকেই নিজের রুচিমাফিক বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করে থাকেন। তবে ফরাসিরা সাধারণত প্রধান খাবারের আগে স্ট্রাটার হিসেবেই রাজহাঁসের বুকের শুকনো মাংসের ছোট ছোট টুকরো রুটি বা সালাদের সঙ্গে খেয়ে থাকেন। এ জন্য পরিমাণ অল্প হলেই চলে। ৩০০ গ্রামের একটি টুকরো দিয়ে ছয় থেকে আটজনের জন্য সালাদ প্রস্তুত করা যেতে পারে।


আমার মনে হয়, আমাদের দেশেও অনেকেই এমন চমৎকার খাবার পছন্দ করবেন।