নিউজ

আতঙ্কিত নয়, সচেতন হোন!করোনা নিয়ে সঠিক ধারণা


সার্স কভ-২ (SARS- Cov- 2) ভাইরাস আর তার থেকে হওয়া কভিড- ১৯ (COVID-19) অসুখ নিয়ে নানারকম তথ্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কিছু সত্য আর কিছু গুজব। এই সুযোগে যে যার মতো করে ব্যাখ্যা/অপব্যাখ্যা করছেন। তাই এ বিষয়ে কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি। চলুন তবে আজ করোনা নিয়ে সঠিক ধারণা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক!


করোনা নিয়ে সঠিক ধারণা রাখুন  

বায়ুবাহিত ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

প্রথমত এ ভাইরাসের বিষয়ে জানতে গেলে বায়ুবাহিত ভাইরাস কিভাবে ছড়ায় সেটা বুঝতে হবে। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে যখন ভাইরাস ছড়ায় তখন তা বাতাসে মিশে যায় বা অন্য কোন বস্তুর ওপর পড়ে। তাই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বা ভাইরাস আক্রান্ত কোন বস্তু ধরলে সেখান থেকে এ জীবাণু অন্যের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। আর এটাই কারণ যে ভাইরাস থেকে বাঁচতে বারবার হাত ধুতে এবং মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।


করোনা ভাইরাসের কর্মক্ষমতা ও তাপমাত্রার সাথে সম্পর্ক 

এছাড়াও অ্যালকোহলিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, এটা কেন? এটা বুঝতে হলে একটু ভাইরাসের গঠন সম্পর্কে বুঝতে হবে। সোজা বাংলায় বললে ভাইরাস মূলত প্রোটিন আর ফ্যাটের তৈরি একটি জীবাণু। হ্যান্ড স্যানিটাইজারে (hand sanitizer) উপস্থিত অ্যালকোহল এই প্রোটিন আর ফ্যাটকে নষ্ট করে ভাইরাসের কাজের ক্ষমতা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ফলে এটি মানুষের দেহে অতটা ভয়াবহ এফেক্ট করতে পারে না।

অনেকেই আবার বলছেন যে অতিরিক্ত গরমে এই ভাইরাস নষ্ট হয়ে যাবে তাই চিন্তার কিছু নেই। এর পেছনে একটি থিওরি হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সার্স  (SARS) ভাইরাস সাধারণত শীতকালে ছড়ায় এবং বসন্ত আসতে আসতে এর প্রাদুর্ভাব কমতে শুরু করে। যেহেতু সার্স কভ-২ (SARS- Cov- 2)- এর সাথে সার্স (SARS) ভাইরাসের ৯০% গঠন মিলে, তাই ধারণা করা হচ্ছে হয়তো এ ভাইরাসটিও অতিরিক্ত গরমে টিকতে পারবে না। তবে এসবই এখনো অনুমান নির্ভর তথ্য। ২০০৭ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায় গ্রীষ্মে যখন বাতাসে হিউমিডিটি বা আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে তখন হাঁচি-কাশির সাথে বেরিয়ে আসা ভাইরাল ড্রপলেট (viral droplet) পরিবেশ থেকে ময়েশ্চার নিয়ে অনেক ভারী হয়ে যায় এবং বেশি সময় বাতাসে ভাসতে পারে না ফলে মাটিতে পড়ে যায় এবং ম্যান-টু-ম্যান ট্রান্সমিশনের মাত্রা কমে যায়। এটিও অন্যতম কারণ এটা ভাবার যে গ্রীষ্মে এর প্রভাব অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু এখানে আমার দু’টি প্রশ্ন আছে। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়া/ব্রাজিলের মতো দেশেও করোনা ছড়িয়েছে শীত আসার আগেই তাই আদৌ এ নিয়ম এ ভাইরাসের ক্ষেত্রে খাটে কিনা বলা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকে না তাই ছড়ায় কম এ নিয়ম সেসব দেশের ক্ষেত্রে প্রজোজ্য হতে পারে যেখানে মানুষের সংখ্যা কম। কিন্তু এত ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এ নিয়ম কতটা প্রযোজ্য হবে তা চিন্তার বিষয়। এছাড়াও এটি যেহেতু একটি নতুন ভাইরাস তাই এর সংস্পর্শে মানুষের দেহ কিভাবে রিয়েক্ট করে এটিও এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে।


করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানুষের ডেথ রেট

 তবে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য এ ভাইরাসের বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে৷ যেমন- এ ভাইরাসে নারীর চেয়ে পুরুষের ডেথ রেট বেশি। কেন এমনটা তা বুঝতে হলে নারী-পুরুষের জেনেটিক গঠন বুঝতে হবে। এক্স ক্রোমোজম (x-chromosome) এর প্যাথোজেন বা অসুখ হওয়ার পেছনে দায়ী অর্থাৎ এটি যেকোনো কিছুর কারণ ধরতে পারার ক্ষমতা বেশি। আর কারণ বুঝতে পারলে তবেই তো দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করবে। যেহেতু নারীদের এক্স ক্রোমোজম দু’টি আর পুরুষদের একটি এক্স ক্রোমোজম একটি এবং অন্যটি ওয়াই ক্রোমোজম (y- chromosome) তাই স্বভাবতই পুরুষের চেয়ে নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। আর এটিই কারণ যে করোনা আক্রান্ত পুরুষের মৃত্যুহার ২.৮%; যা নারীদের (১.৭%) চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। এছাড়াও যারা মারা গিয়েছেন তাদের মধ্যে আশি শতাংশই ছিলেন বয়োবৃদ্ধ (৬০ বছরের বেশি বয়ষ্ক) এবং শতকরা ৭৫ ভাগের মধ্যেই অন্যান্য অসুখের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। যেমন- কার্ডিওভাস্কুলার  ডিজিজ, ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, ক্যান্সার ইত্যাদি অর্থাৎ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগে থেকেই কম ছিল।


করোনা আক্রান্ত মানেই মৃত্যু নয় 

এত এত খারাপ খবর দেখে যাদের মন খারাপ হয়ে গিয়েছে তাদের এবার একটু ভালো খবর দেই। করোনা আক্রান্ত হওয়া মানেই অবধারিত মৃত্যু নয়। কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের কেস ফ্যাটালিটি প্রোপরশন অর্থাৎ ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের তুলনায় মারা গিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা গড়ে মাত্র ৩%। আর করোনা ভাইরাসের অনেকগুলো টাইপ রয়েছে। এর মাঝে ৭টি টাইপ দিয়ে মূলত অসুখ হয়। এর মাঝেও আবার ৪টি টাইপ দিয়ে শুধুমাত্র নরমাল হাঁচি-কাশির মতো সমস্যা হয়। কাজেই এত ভয় না পেয়ে কিভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় সেটিই এখন ভেবে দেখার বিষয়।


করোনা নিয়ে সঠিক ধারণা নিয়ে কিভাবে এ ভাইরাস মুক্ত থাকবো ?

প্রথমত করোনা কবে আসবে, কী হবে এসব না ভেবে নিজের ওভারঅল হেলথ কন্ডিশনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রেশার, ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকলে সেটি কন্ট্রোলে রাখা জরুরি। সুস্থ মানুষের মাস্ক পড়ে বসে থাকার চেয়ে অসুস্থ মানুষ যেন ভাইরাস না ছড়ান সেটি অধিক জরুরি। আপনার যদি ঠান্ডা-কাশি থাকে তবে অনুগ্রহ করে মাস্ক পড়ুন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাথে রাখুন এবং অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে নিজেকে সংবরণ করুন। কেননা দিন শেষে এতে আপনার, আমার, আমাদের সবার শুধু ক্ষতিই হবে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। একটু হলেও মনে সাহস সঞ্চার করবে। সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতার পথ অবলম্বন করুন। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন!