নিউজ

ফ্রান্সের শীতকালীন খাবার : পোতো ফুঁ


কাগজে–কলমে প্রতিবছর ২১ ডিসেম্বর থেকে ফ্রান্সে শীতকাল শুরু হয় আর শেষ হয় ২০ মার্চ। এ সময় প্রায়ই ছাইরঙা মেঘে আকাশ মুখ গোমড়া করে থাকে। মাঝেমধ্যে বরফকুচি মেশানো বৃষ্টি আর পেঁজা তুলার মতো তুষার নেমে আসে। মাঠ-ঘাট–প্রান্তর, পাতাহীন গাছগাছালি তুষারের আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। শহর থেকে একটু দূরে গেলেই বাড়ির বাইরে লোকজন একদম দেখা যায় না বললেই চলে। অনুচ্চ পাহাড়ের ঢালের ছড়ানো–ছিটানো বাড়িগুলোর চিমনি থেকে সাদা ধোঁয়া ঘুরে ঘুরে আকাশে উঠে যায়। সেসব ঘরের রসুইয়ে উঁকি দিলে প্রায়ই যা চোখে পড়ে, তা হলো ফরাসিদের খুব প্রিয় খাবার ‘পোতো ফুঁ’।


পোতো ফুঁর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘আগুনে (উনুনে) হাঁড়ি’। এটি ফরাসিদের খুবই প্রিয় একটি খাবার। আসলেই খাবারটি চেনে না বা এর স্বাদ আস্বাদন করেনি—এমন একজন ফরাসিকে খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর হবে। সেই যখন থেকে এ অঞ্চলের মানুষ রান্নার জন্য হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করতে শুরু করেছে, অর্থাৎ সেই নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে থেকেই এ খাবার অন্য সব খাবারকে অনেক দূরে রেখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। 


শীতকালীন খাবার হলেও রন্ধনশিল্পের পুরোধা ব্যক্তিরা পোতো ফুঁকে ফ্রান্সের জাতীয় ডিশ বা খাবার হিসেবে আখ্যায়িত করতেও দ্বিধা করেননি।


ইতিহাস

আগুন আবিষ্কারের পর আদিম মানুষ মাংস ঝলসিয়ে খেতে শুরু করে—এটি জনপ্রিয় মত। এরপর মাটি-পাথরের পাত্র ব্যবহার করতে পারদর্শী হলে মাংস সেদ্ধ করে যখন খেতে শিখল, তখন তা হলো মানবসভ্যতার আরেক ধাপ অগ্রগতি। নব্যপ্রস্তর বা নিওলিথিক যুগেও এ খাবারের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। তবে রোমানদের সময় বিশেষ মাত্রা লাভ করে এবং আলাদা একটি খাবার হিসেবে পরিচিতি পায় পোতে ফুঁ।

এর রন্ধনপ্রণালি যেমন বেশ সহজ, তেমনি উপকরণগুলোও বেশ সহজলভ্য। শীতের দিনের সবজি ও মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংস হচ্ছে মূল উপকরণ। একটুখানি মাংস আর খানিকটা সবজি, অনেকটা পানিতে সেদ্ধ করে সুপের মতো একটি মাত্র ব্যঞ্জন হলেই একবেলা আহারের ব্যবস্থা হয়ে যেত সে সময়। সে কারণেই রোমান সাম্রাজ্যে এ খাবার ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুধু ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এটি সাধারণের একচেটিয়া অধিকার থেকে মুক্ত হয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের খাবার টেবিলে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের নামকরা রেস্তোরাঁর শেফরা তাঁদের মতো করে এই সাধারণের খাবারকে অসাধারণ মহিমায় পরিবেশন করছেন। তা ছাড়া ফ্রান্সের অঞ্চলভেদে উপকরণে হেরফের হলেও রন্ধনপ্রণালি প্রায় একই।


যেভাবে তৈরি করা হয়

উপকরণ


ছয়জনের জন্য


১. গরুর মাংস ১ কেজি ৮০০ গ্রাম। গরুর পেছনের রানের নিচের দিকের হাড়সহ ৬০০ গ্রাম মাংস, সামনের রানের ওপর দিকের পেশির মাংস ৬০০ গ্রাম, চোয়ালের মাংস ৬০০ গ্রাম। এভাবে গরুর তিন ধরনের মাংস মোট ১ কেজি ৮০০ গ্রাম। মোটকথা, গরুর তিন ধরনের মাংস হলে ভালো হয়।


২. মজ্জাসহ গরুর রানের হাড়ের ৬টি ছোট টুকরা, মাঝারি আকারের শালগম ৬টি, মাঝারি আকারের গাজর ৮টি, আলু মাঝারি আকারের ৩টি, লিক ২টি, সাদা পেঁয়াজ ২টি, রসুন ৩ কোয়া, আদা এক টুকরা (১০০ গ্রাম), সেলেরির ২টি লম্বা ডাঁটা, গোলমরিচ ২৫ গ্রাম (গুঁড়ো অথবা দানা), তেজপাতা, থাইম, সুগন্ধি গুল্ম ইত্যাদি পরিমাণমতো, লবঙ্গ ৪ থেকে ৬টি, বড় দানার লবণ ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ।


রন্ধনপ্রণালি

ঠান্ডা পানিতে মাংস খুব ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর বড় একটা পাত্রে পানিতে ডুবিয়ে হালকা আঁচে প্রায় দুই ঘণ্টা সেদ্ধ করতে হবে। এ সময়ে কিছুক্ষণ পরপরই ফেনা তুলে ফেলতে হবে। কোনোভাবেই মাংস সেদ্ধর সময়ের ফেনা রাখা চলবে না। এক ঘণ্টা পরে এর সঙ্গে মজ্জাসহ গরুর রানের হাড়ের টুকরাগুলো এবং গোলমরিচ, তেজপাতা, থাইম ইত্যাদি যোগ করতে হবে।


যতক্ষণ না মাংস সেদ্ধ হচ্ছে, সে সময়ে সবজি পরিষ্কার করে খোসা ছাড়িয়ে তৈরি রাখতে হবে। সাদা পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে লবঙ্গগুলো তার গায়ে গেঁথে দিতে হবে। মাংস সেদ্ধ হয়ে গেলে পরিমাণমতো বড় দানার লবণ, সবজিসহ বাকি উপকরণ সব একসঙ্গে দিয়ে যতক্ষণ না সব সবজি সেদ্ধ না হয়, ততক্ষণ হালকা আঁচে চুলোর ওপর রাখতে হবে। রান্নার সময় পাত্র ঢাকনা না দিতে অনেক শেফ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁদের মতে, তাতে স্বাদ বাড়ে। আবার কেউ কেউ খাবারে ঘ্রাণ ধরে রাখার জন্য ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার জন্য বলেন।


রান্নার প্রণালি ও উপকরণ সব প্রায় এ রকমই। তবে অনেকেই নিজের মতো করে রান্না করেন। অনেকেই নিজের মতো করে সবজি দিতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ গরুর মাংসের বদলে হাঁস-মুরগির মাংস, এমনকি মাছ দিয়েও চমৎকার পোতো ফুঁ তৈরি করে নাম কুড়িয়েছেন। আর শেফরা তাঁদের স্বতন্ত্র বজায় রাখতে গিয়ে নানা উপাদানে, কৌশলে যেমন দৃষ্টি নন্দন তেমনি অতুলনীয় স্বাদের খাবারটি পরিবেশন করে থাকেন।


যেভাবে পরিবেশন করা হয়

বেশ সময় ধরে হালকা আঁচে রান্নার ফলে মাংসে যেমন সবজির চমৎকার ঘ্রাণ হয়, তেমনি সবজিতে মাংসের ঘ্রাণ মিশে যায়। গরম-গরম মাংস, সবজি আর ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি সুপ সরাসরি পরিবেশন করা হয়। সঙ্গে ভাজা টোস্ট, রুটি ও খানিকটা শর্ষেবাটা অনেকেই পছন্দ করেন।


ফ্রান্সের খুব জনপ্রিয় শীতকালীন খাবারটি যেমন ধনী-দরিদ্রকে এক সারিতে এনেছে, তেমনি বহু প্রাচীন এই সুস্বাদু খাবার আজও একইভাবে ফরাসিদের খাবার টেবিল দখল করে আছে। বিশেষ করে তুষারপাতের দিনগুলোয় অপূর্ব এই খাবার হৃদয়কে উষ্ণ করে।